জমি বন্ধক রাখার শরয়ী পদ্ধতি:
বর্তমান সমাজে জমি বন্ধকের প্রচলন রয়েছে।অহরহ জমি বন্ধক দেওয়া হচ্ছে বা নেওয়া হচ্ছে।কিন্তু জমি বন্ধকের ইসলামী নিয়মনীতি কি এ সম্পর্কে অনেকেরই কোনো ধারণা নেই।
ইসলাম এ প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে কি বলে?
আসুন কিছুটা সময় ব্যয় করে এ সম্পর্কে কিছু শরয়ী বিধি-বিধান জেনে নেই।
যাতে ইহকাল ও পরকালের সঠিক রাস্তা অর্জন করতে সহায়ক হয়।
বন্ধকের সংজ্ঞা বর্ণনা করতে যেয়ে আল্লামা হাসক্বফী রাহ বলেনঃ
(هُوَ) لُغَةً: حَبْسُ الشَّيْءِ.
وَشَرْعًا (حَبْسُ شَيْءٍ مَالِيٍّ) أَيْ جَعْلُهُ مَحْبُوسًا لِأَنَّ الْحَابِسَ هُوَ الْمُرْتَهِن (ُ بِحَقٍّ يُمْكِنُ اسْتِيفَاؤُهُ)
তরজমাঃ
রেহেন(বন্ধক)এর শাব্দিক অর্থ কোনো কিছুকে বন্ধী করে রাখা।
পারিভাষায় রেহেন বলা হয়,কোনো জিনিষকে হক্ব বা কোনো প্রাপ্তধনের মুকাবেলায় বন্ধী করে রাখা।যাতে পরিবর্তীতে তা দিয়ে নিজ প্রাপ্যকে উসূল করা যায়।
আদ-দুর্রুল মুখতার-৬/৪৭৭।
বন্ধক পদ্ধতি বৈধ তবে এক্ষেত্রে শরয়ী নীতিমালাকে মানতে হবে।বুঝতে হবে বন্ধক পদ্ধতি কি? এবং কি জন্য শরীয়ত বন্ধক পদ্ধতিকে বৈধ ঘোষণা করেছে।
সুতরাং শরীয়তের গন্ডীর ভিতর থেকে বন্ধক দিতে বা নিতে হবে।
বন্ধক পদ্ধতির বৈধতা কোরআন-হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
যেমনঃ
বন্ধক পদ্ধতির বৈধতা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলেনঃ
ﻭَﺇِﻥكُنْتُمْْ ﻋَﻠَﻰ ﺳَﻔَﺮٍ ﻭَﻟَﻢْ ﺗَﺠِﺪُﻭﺍْ ﻛَﺎﺗِﺒًﺎ ﻓَﺮِﻫَﺎﻥٌ ﻣَّﻘْﺒُﻮﺿَﺔٌ ﻓَﺈِﻥْ ﺃَﻣِﻦَ ﺑَﻌْﻀُﻜُﻢ ﺑَﻌْﻀًﺎ ﻓَﻠْﻴُﺆَﺩِّ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺍﺅْﺗُﻤِﻦَ ﺃَﻣَﺎﻧَﺘَﻪُ ﻭَﻟْﻴَﺘَّﻖِ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺭَﺑَّﻪُ ﻭَﻻَ ﺗَﻜْﺘُﻤُﻮﺍْ ﺍﻟﺸَّﻬَﺎﺩَﺓَ ﻭَﻣَﻦ ﻳَﻜْﺘُﻤْﻬَﺎ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﺁﺛِﻢٌ ﻗَﻠْﺒُﻪُ ﻭَﺍﻟﻠّﻪُ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ ﻋَﻠِﻴﻢٌ
তরজমাঃ
আর তোমরা যদি প্রবাসে থাক এবং কোন লেখক না পাও,তবে (ঋণের মুকাবেলায়)বন্ধকী বন্তু হস্তগত করে রাখা উচিত। যদি একে অন্যকে বিশ্বাস করে, তবে যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করা।
তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা করা, আল্লাহ সে সম্পর্কে খুব জ্ঞাত।
সূরা বাক্বারা-২৮৩।
বন্ধকের বৈধতা সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে, নবীজী সাঃ নিজেও বন্ধক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
যেমনঃ
হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত,তিনি বলেনঃ
ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ ﻗﺎﻟﺖ ﺍﺷﺘﺮﻯ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻣﻦ ﻳﻬﻮﺩﻱ ﻃﻌﺎﻣﺎ ﺑﻨﺴﻴﺌﺔ ﻓﺄﻋﻄﺎﻩ ﺩﺭﻋﺎ ﻟﻪ ﺭﻫﻨﺎ
ভাবার্থ
নবীজী সাঃ এক ইহুদির কাছ থেকে বাকীতে(নির্দিষ্ট সময়ে মূল্য পরিশোধের শর্তে) খাদ্য ক্রয় করেছেন,অতঃপর মূল্যর জামিন হিসাবে নিজ বর্মকে বন্ধক রেখেছেন।
সহীহ মুসলিম-১৬০৩।
ইমাম নববী রাহ,উক্ত হাদীসের ব্যখ্যায় বলেনঃ
ﻭﻓﻴﻪ ﺟﻮﺍﺯ ﺍﻟﺮﻫﻦ ، ﻭﺟﻮﺍﺯ ﺭﻫﻦ ﺁﻟﺔ ﺍﻟﺤﺮﺏ ﻋﻨﺪ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺬﻣﺔ ، ﻭﺟﻮﺍﺯ ﺍﻟﺮﻫﻦ ﻓﻲ ﺍﻟﺤﻀﺮ ، ﻭﺑﻪ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺸﺎﻓﻌﻲ ﻭﻣﺎﻟﻚﻭﺃﺑﻮ ﺣﻨﻴﻔﺔ ﻭﺃﺣﻤﺪ ﻭﺍﻟﻌﻠﻤﺎﺀ ﻛﺎﻓﺔ ﺇﻻ ﻣﺠﺎﻫﺪﺍ ﻭﺩﺍﻭﺩ ﻓﻘﺎﻻ : ﻻ ﻳﺠﻮﺯ ﺇﻻ ﻓﻲ ﺍﻟﺴﻔﺮ
ভাবার্থ-
উক্ত হাদীস দ্বারা বন্ধকের বৈধতা প্রমাণিত হলো।এমনকি কাফিরের কাছে যুদ্ধাস্ত্র বন্ধক রাখারও বৈধতা প্রমাণিত হলো।
শুধু তাই নয় বরং মুক্বিম অবস্থায় ও বন্ধক রাখার বৈধতা প্রমাণিত হলো।
এটাই ইমাম শাফেয়ী রাহ,ইমাম আবু হানিফা রাহ,ও ইমাম মালিক রাহ,এবং ইমাম আহমদ রাহ,এর মাযহাব ও অভিমত।
আল-মিনহাজ,শরহে নববী-পৃঃ২১৮।
ইবনে আবেদীন শামী রাহ,বন্ধক পদ্ধতির বৈধতা সম্পর্কে বলেনঃ
[ كِتَابُ الرَّهْنِ]
ِ هُوَ مَشْرُوعٌ، لِقَوْلِهِ تَعَالَى – {فَرِهَانٌ مَقْبُوضَةٌ} [ البقرة: 283] – وَبِمَا رُوِيَ «أَنَّهُ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ – اشْتَرَى مِنْ يَهُودِيٍّ طَعَامًا وَرَهَنَهُ بِهِ دِرْعَهُ» وَانْعَقَدَ عَلَيْهِ الْإِجْمَاعُ.
ভাবার্থঃ-
বন্ধক পদ্ধতি কোরআনে কারীমের সূরা বাকারার ২৮৮নং আয়ত দ্বারা প্রমাণিত এবং নবীজী সাঃ কর্তৃক নিজ বর্মকে বন্ধক রাখা দ্বারাও প্রমাণিত হয়।সর্বোপরি বৈধতার উপর উলমায়ে কেরামদের ইজমা বা ঐক্যমত ও রয়েছে।
রদ্দুল মুহতার-৬/৪৭৭।
সমাজে জমি বন্ধকের প্রচলিত কিছু পদ্ধতি-
এসমস্ত পদ্ধতিগুলোর হুকুম নিয়ে এখন আলোচনার প্রয়াস পাবো।
এক.
বন্ধকদাতা বন্ধক গ্রহীতার নিকট থেকে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা গ্রহণ করে আর বন্ধকগ্রহীতা জমি ভোগ করতে থাকে।
যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন জমি হস্তান্তর করে।
দুই.
এটিও উপরের মতোই। তবে পার্থক্য হল, এক্ষেত্রে যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন বছর হিসাব করে বন্ধকগ্রহীতা কিছু টাকা কম নেয়।
যেমন-কেউ এক কাঠা জমি বন্ধক নিল দশ হাজার টাকায় এবং সে দু বছর এ জমি ভোগ করে। দু বছর পর টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় পাঁচশ টাকা করে এক হাজার টাকা কম নেয়।
এখন প্রশ্ন জাগো আমাদের সমাজে
প্রচলিত এ পদ্ধতিগুলো সহীহ কি না?
উপরন্তু এ সম্পর্কে বিকল্প কোনো বৈধ পদ্ধতি রয়েছে কি না?
এ নিয়ে আজকের নিম্নোক্ত কিছু পর্যালোচনা।
ধৈর্য্য সহকারে পড়ার অনুরুধ রইলো।
ঋণদাতার জন্য বন্ধকি জমি ভোগ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয।
এটি মূলত ঋণ প্রদান করে বিনিময়ে সুদ গ্রহণেরই একটি প্রকার।
সুতরাং উপরোল্লেখিত প্রথম পদ্ধতিটি নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট।
এ সম্পর্কে আল্লামা হাসক্বফী রাহ, বলেন।
(لَا انْتِفَاعَ بِهِ مُطْلَقًا) لَا بِاسْتِخْدَامٍ، وَلَا سُكْنَى وَلَا لُبْسٍ وَلَا إجَارَةٍ وَلَا إعَارَةٍ، سَوَاءٌ كَانَ مِنْ مُرْتَهِنٍ أَوْ رَاهِنٍ (إلَّا بِإِذْنِ) كُلٍّ لِلْآخَرِ، وَقِيلَ لَا يَحِلُّ لِلْمُرْتَهِنِ لِأَنَّهُ رِبًا، وَقِيلَ إنْ شَرَطَهُ كَانَ رِبًا وَإِلَّا لَا.
وَفِي الْأَشْبَاهِ وَالْجَوَاهِرِ: أَبَاحَ الرَّاهِنُ لِلْمُرْتَهِنِ أَكْلَ الثِّمَارِ أَوْ سُكْنَى الدَّارِ أَوْ لَبَنِ الشَّاةِ الْمَرْهُونَةِ فَأَكَلَهَالَمْ يَضْمَنْ وَلَهُ مَنْعُهُ، ثُمَّ أَفَادَ فِي الْأَشْبَاهِ أَنَّهُ يُكْرَهُ لِلْمُرْتَهِنِ الِانْتِفَاعُ بِذَلِكَ،
তরজমাঃ
বন্ধককৃত জমি দ্বারা কোনোভাবেই উপকৃত হওয়া যাবে না।
না বন্ধককৃত জিনিষ থেকে কোনোপ্রকার খেদমত গ্রহণ করা যাবে,
না তাকে বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে,
না পোষাক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে,
এমনকি উক্ত জিনিষ কাউকে ভাড়া বা আরিয়ত (ব্যবহার অনুমিত)হিসেবেও দেওয়া যাবে না।
বন্ধকদাতা বা বন্ধকগ্রহীতা কেউ-ই তা পারবে না।
তবে বন্ধকদাতা ও বন্ধকগ্রহীতা একে অপরের অনুমতি সাপেক্ষে উপরোক্ত বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে পারবে।
কেউ কেউ বলেন বন্ধকগ্রহীতা কখনো উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে পারবে না।কেননা তা সুদ হয়ে যাবে।
আবার কেউ কেউ বলেন,
বন্ধক চুক্তির সময় বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের চুক্তি থাকলে সুদ হবে নতুবা সুদ হবে না।
আল-আশবাহ ওয়াল জাওয়াহির নামক কিতাবে বর্ণিত আছে,যদি বন্ধকদাতা বন্ধকগ্রহীতার জন্য গাছের ফলমূল বা তাতে বসবাস বা বকরী হলে তা থেকে দুধ খাওয়ার অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে বৈধ হবে।
এবং যদি সে উক্ত সুবিধাদি গ্রহণ করে ফেলে তাহলে সে যামিন হবে না।তবে বন্ধকগ্রহীতা তাকে বাধা প্রদানও করতে পারবে।
অতঃপর আশবাহ ওয়াল জাওয়াহির নামক কিতাবে উল্লেখ করা হয়,
বন্ধকগ্রহীতার জন্য সাধারণত বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করা মাকরুহ।
আদ-দুর্রুল মুখতার ৬/৪৮২-৮৩।
আমীন ইবনে উমর ইবনে আব্দুল আজীজ আবেদীন “শামী” রাহ উক্ত ইবারত সমূহের বিস্তারিত ব্যখার এক পর্যায়ে বলেনঃ
(قَوْلُهُ وَقِيلَ لَا يَحِلُّ لِلْمُرْتَهِنِ) قَالَ فِي الْمِنَحِ: وَعَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ أَسْلَمَ السَّمَرْقَنْدِيِّ وَكَانَ مِنْ كِبَارِ عُلَمَاءِ سَمَرْقَنْدَ أَنَّهُ لَا يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَنْتَفِعَ بِشَيْءٍ مِنْهُ بِوَجْهٍ مِنْ الْوُجُوهِ وَإِنْ أَذِنَ لَهُ الرَّاهِنُ، لِأَنَّهُ أَذِنَ لَهُ فِي الرِّبَا لِأَنَّهُ يَسْتَوْفِي دَيْنَهُ كَامِلًا فَتَبْقَى لَهُ الْمَنْفَعَةُ فَضْلًا فَيَكُونُ رِبًا، وَهَذَا أَمْرٌ عَظِيمٌ.
ভাবার্থ
মিনাহ কিতাবে বর্ণিত আছে,
সমরক্বন্দ এলাকার একজন বিজ্ঞ হানাফী আলেম-“আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আসলাম আস-সামারক্বান্দী” থেকে বর্ণিত আছে,
তিনি বলেনঃ বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করা কোনো ভাবেই বৈধ হবে না।
যদিও বন্ধকদাতা তাতে অনুমতি প্রদান করুক না কেন?
কারণ
প্রথমতঃ
বন্ধকদাতা সুদের মধ্যে অনুমতি প্রদান করছে।
দ্বিতীয়তঃ
বন্ধকগ্রহীতা পরবর্তীতে তার পূর্ণ ঋণ-ই সে উসূল করবে অথচ বন্ধককৃত জিনিষ থেকে সে ইতিপূর্বে ফায়দা গ্রহণ করেছে,সুতরাং ফায়দা গ্রহণটা অতিরিক্ত থেকে যাবে, আর এটাই সূদ,যা অনেক বড় গোনাহ।
রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২;
তবে শর্তসাপেক্ষে বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের কিছু মতামত ও তিনি উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু তিনি বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের বৈধতা ও অবৈধতা সম্পর্কীয় উভয় মতামত পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা করে বলেনঃ
ﻗَﺎﻝَ ﻃ: ﻗُﻠْﺖُ ﻭَاﻟْﻐَﺎﻟِﺐُ ﻣِﻦْ ﺃَﺣْﻮَاﻝِ اﻟﻨَّﺎﺱِ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﺇﻧَّﻤَﺎ ﻳُﺮِﻳﺪُﻭﻥَ ﻋِﻨْﺪَ اﻟﺪَّﻓْﻊِ اﻻِﻧْﺘِﻔَﺎﻉَ، ﻭَﻟَﻮْﻻَﻩُ ﻟَﻤَﺎ ﺃَﻋْﻄَﺎﻩُ اﻟﺪَّﺭَاﻫِﻢَ ﻭَﻫَﺬَا ﺑِﻤَﻨْﺰِﻟَﺔِ اﻟﺸَّﺮْﻁِ، ﻷَِﻥَّ اﻟْﻤَﻌْﺮُﻭﻑَ ﻛَﺎﻟْﻤَﺸْﺮُﻭﻁِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣِﻤَّﺎ ﻳُﻌَﻴِّﻦُ اﻟْﻤَﻨْﻊَ، ﻭَاَﻟﻠَّﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﺃَﻋْﻠَﻢُ اﻩـ.
ভাবার্থঃ-
আমার ধারণা-মানুষের বর্তমান অবস্থা এমন যে তারা ঋণ দিয়ে বন্ধককৃত জিনিষ গ্রহণের সময় উক্ত জিনিষ থেকে উপকার গ্রহণের-ই নিয়্যাত করে থাকে।এবং বাস্তবতাও এমন যে, উপকার না থাকলে সে ঋণ দেবে না। কেনই বা সে ঋণ দেবে?
সুতরাং ফায়দা গ্রহণটা শর্তের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যাবে।কেননা প্রসিদ্ধ প্রথা বা পদ্ধতি শর্তের মতই হয়ে থাকে।
যে জন্য তথাকথিত বন্ধক পদ্ধতিক নিষিদ্ধ হবে।
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।
রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২;
বিদগ্ধ গবেষক বিশিষ্ট মুহাক্কিক আল্লামা আব্দুল হাই লেখনৌভী রাহ, বন্ধককৃত জমি থেকে ফায়দা গ্রহণের শরয়ী বিধি-বিধান ও ফুকাহায়ে কেরামদের ভিন্নরকম আলোচনায় সামঞ্জস্যসাধন করতে যেয়ে ২১ পৃষ্টার আলাদ একটি পুস্তিকা রচণা করেছেন।
যার নাম হল-
ﺍﻟﻔﻠﻚ ﺍﻟﻤﺸﺤﻮﻥ ﻓﻴﻤﺎ ﻳﺘﻌﻠﻖ ﺑﺎﻧﺘﻔﺎﻉ ﺍﻟﻤﺮﺗﻬﻦ ﺍﻟﻤﺮﻫﻮﻥ
-আলফালাকুল মাশহুন ফিমা য়াতা’আল্লাকু বি-ইনতেফায়িল মুরতাহিনিল মারহুন-
উনার স্বভাবজাত তাত্ত্বিক আলচনার এক পর্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন:
বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করা যাবে কি না?এ সম্পর্কে চার মাযহাবে মতবিরোধ রয়েছে।
এ মতবিরোধের সূচনা মূলত নিম্নোক্ত হাদীসকে ঘিরেই হয়েছে।
যা ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হাদীসে মাশহুর গ্রন্থ সমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
নিম্নে বুরখীর রেওয়াত উল্লেখ করা হলঃ-
ইমাম বুখারী হযরত আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণনা করেন
2376ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﻳﻘﻮﻝ ﺍﻟﺮﻫﻦُ ﻳُﺮﻛﺐ ﺑﻨﻔﻘﺘﻪ ﻭﻳُﺸﺮﺏ ﻟﺒﻦُ ﺍﻟﺪَّﺭِّ ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﻣﺮﻫﻮﻧﺎ
ﺍﻟﻜﺘﺐ » ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ » ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺮﻫﻦ » ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺮﻫﻦ ﻣﺮﻛﻮﺏ ﻭﻣﺤﻠﻮﺏ
খাদ্যর বিনিময়ে বন্ধককৃত জানোয়ারের উপর সওয়ার হওয়া যাবে,এবং দুধাল জানোয়ারের দুধও পান করা যাবে।
সহীহ বুখারী-২৩৭৬।
অতঃপর তিনি ৬নং পৃষ্টায় উল্লেখ করেনঃ-
و قد ظهر من هذه العبارات وغيرها من كلمات الثقات أنهم اختلفوا في الحديث المذكور علي أقوال
أحدها :حمله علي ارتفاع الراهن وهو مسلك الشافعية
وثانيها حمله علي ارتفاع المرتهن مطلقا وإن لم يأذن له الراهن وهو مسلك إمام الحنابلة
وثالثها حمله علي ارتفاع المرتهن بإذن الراهن وهو مذهب جمهور علماء الأمة
ورابعها كونه منسوخا بتحريم القرض مع جر المنفعة،
“ولا يخفى علي المنصف الغير المتعسف ان أعلى الأقوال فيه هو حمله علي انتفاع المرتهن عند إذن الراهن ،لكن بشرط أن لا يكون مشروطا حقيقية او حكما كما سيأتي فيما يأتي
উপরোক্ত হাদীসের আলোকে
বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা সম্পর্কীয় হুকুম-আহকাম বর্ণনায় ফুকাহায়ে কেরাম বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেন।
যথাঃ-
(১)ইমাম শা’ফী এর মতে বন্ধককৃত জিনিষ থেকে রাহিন(বন্ধকদাতা)এর জন্য ফায়দা গ্রহণ করা জায়েয।
(২)হাম্বলী মাযহাব অনুসারে
মুরতাহিন(বন্ধকগ্রহীতা)এর জন্য উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ জায়েয।
এক্ষেত্রে বন্ধকদাতার অনুমতি কোনো প্রয়োজন নেই।
(৩)জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে
বন্ধকদাতার অনুমতিক্রমে বন্ধকগ্রহীতা উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে পারবে।
(৪)রেহেন পদ্ধতির বৈধতা রহিত হয়ে গেছে।
নবীজী সাঃ ঐ হাদীসের মাধ্যমে যেথায় তিনি বলেছেনঃ
” যে সমস্ত ঋণ লাভকে টেনে নিয়ে আসবে তা হারাম”
নিরপেক্ষ বিচারকের সামনে নিঃসন্দেহে এ বিষয়ে কোনো প্রকার অস্পষ্টতা থাকবে না যে,
পুর্বে উল্লেখিত মতামত সমুহের মধ্যে
সর্বোত্তম মত হচ্ছে, বন্ধকদাতার অনুমতিক্রমে বন্ধকগ্রহীতা উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করতে পারবে।
তবে শর্ত হচ্ছে,ফায়দা গ্রহণের কোনোপ্রকার শর্তাররোপ থাকতে পারবে না।হাক্বীকি (প্রকাশ্যে) শর্ত হোক বা উরফি (অপ্রকাশ্যে) হোক।
অতঃপর তিনি হানাফী মাযহাবের উলামায়ে কেরামদের বিরোধমূলক মতামত উল্লেখ করে একটি সিদ্ধান্তমূলক আলোচনার একপর্যায়ে ৯নং পৃষ্টায় উল্লেখ করেনঃ
إعلم أنهم بعد ما اتفقوا على انه لا يجوز للمرتهن الانتفاع بالرهن بدون إذن الراهن ،اختلفوا فى جوازه بالإذن على أقوال عديدة كما دلت عليها عباراتهم المختلفة ،
(الأول) أنه جائز
(الثاني)انه ليس بجائز ،
(الثالث)انه جائز قضاء غير جائز ديانة
(الرابع)ان الإذن ان كان مشروطا فهو غير جائز وإلا فهو جائز
(الخامس)أنه ان كان الاذن مشروطا فهو حرام وان لم يكن مشروطا فهو مكروه ،
বন্ধকদাতার অনুমতি সাপেক্ষে বন্ধককৃত মাল থেকে বন্ধকগ্রহীতার জন্য ফায়দা গ্রহণ সম্পর্কে হানাফী উলামায়ে কেরামদের মতবিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে,
যা তাদের স্ব সস্ব কিতাবের ইবারত থেকে পরিলক্ষিত হয়।
(১)জায়েয।
(২)না জায়েয।
(৩)কাযাআন (দুনিয়ার বৈচারিক নিমিত্তে) জায়েয,কিন্তু দিয়ানাতান(আল্লাহর কাছে)
না জায়েয।
(৪)শর্ত থাকলে নাজায়েয,নতুবা জায়েয।
(৫)শর্ত থাকলে হারাম নতুবা মাকরুহ।
واولى الأقوال المذكورة واصحهاواوفقها بالروايات الحديثية هو القول الرابع أن ما كان مشروطا يكره وما لم يكن مشروطا لا يكره ،
চতুর্থ শ্রেণীর মতামতই হচ্ছে
হাদীসের সাথে সবচেয়ে বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সর্বোত্তম বিশুদ্ধ মতামত।
অর্থাৎ ফায়দা গ্রহণের শর্ত থাকলে মাকরুহ (তাহরীমি)নতুবা জায়েয।
أما كراهة المشروط فلحديث كون القرض الذي جر منفعة فهو ربا ،أما عدم كراهة غيرالمشروط فلحديث الظهر يُركب بنفقته ولبن الدر يشرب ،والمراد بالكراهة التحريمية كما يفيده تعليلهم بأنه ربا،وهي المرادة من الحرمة في قول من تكلم بحرمة المشروط ،فإن المكروه التحريمي قريب من الحرام ،بل كأنه هو ،
ثم المشروط اعم من ان يكون مشروطا حقيقيا او حكما ،
শর্ত থাকলে মাকরুহ কেননা হাদীসে এসেছে,
“প্রত্যেক ঐ ঋণ যা মুনাফাকে টেনে নিয়ে আসবে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।
আর শর্ত না থাকলে হযরত আবু হুরায়রা রাযি এর উপরোক্ত হাদীসের ধরুণ মাকরুহ হবে না।
মাকরুহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মাকরুহে তাহরীমি কেননা ফুকাহাগণ মাকরুহ হওয়ার কারণ রিবা উল্লেখ করছেন।
এবং শর্ত থাকা ধরুণ যারা হারাম বলে থাকেনঃ তাদের হারাম বলা দ্বারা মাকরুহে তাহরীমি-ই উদ্দেশ্য। কেননা মাকরুহে তাহরীমি হারামের প্রায় কাঁছাকাঁছিই ।এমনকি মাকরুহে তাহরীমি দ্বারা কখনো স্বয়ং হারামকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়ে থাকে।
ফায়দা গ্রহণমূলক শর্তারোপ ব্যাপকতর
প্রকাশ্যে শর্ত হোক বা অপ্রকাশ্যে শর্ত হোক।সবধরণের শর্তের কারণেই হারাম বলে প্রমাণিত হবে।
أما الحقيقة ;فبأن يشترط المرتهن في نفس عقد الرهن أن يأذن له الراهن بالإرتفاع من الرهن علي ما هو المتعارف في أكثر العوام ،أنهم اذا إرتهنوا شيئا ودفعوا الدين يشترطون إجارة الانتفاع ويكتبون ذالك في الصك الرهن ،ولو لم يأذن له الراهن او لم يكتب في الصك لم يدفع المرتهن الدين ولم يرتهن،
প্রকাশ্য শর্তারোপঃ
বন্ধকগ্রহীতা বন্ধক চুক্তির সময়ে এ শর্ত করবে যে বন্ধকদাতা উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের অনুমতি প্রদাণ করবে।যেমন অধিকাংশ আওয়ামদের কাছে প্রচলিত যে,
যখন বন্ধক চুক্তিতে বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকদাতাকে ঋণ প্রদাণ করে তখন তারা ফায়দা গ্রহণের শর্ত উল্লেখপূর্বক বন্ধক রেজিস্ট্রি পত্রে লিখে রাখে।
যদি বন্ধকদাতা বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের অনুমতি প্রদান না করত বা এ সম্পর্কীয় চুক্তিনামা রেজিস্ট্রি পত্রে উল্লেখ না থাকত তাহলে কখনো বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকদাতাকে ঋণ দিত না এবং বন্ধক চুক্তিও করত না।
أما حكما ;فهو ما تعارف في ديارنا ،أنهم لا يشترطون ذالك في نفس المعاملة لكن مرادهم و منويهم إنما هو الانتفاع ،فلولاه لما دفع المرتهن الدين حتى لو دفع الدين ولم يأذن له الراهن في مجلس آخر او أذن ثم رجع من إذنه يغضب المرتهن ويريد أخذ دينه فالاشتراط وان لم يكن مذكورا في كلامهم لكنه عين مرامهم ،ومن المعلوم أن المعروف كالمشروط ،كما حققه صاحب الأشباه ،
وفرع عليه فروعا كثيرة،فكما ان المشروط حقيقية يتضمن الربا كذالك المشروط حكما من أفراد الربا ،فإن لم يكن ربا حقيقية فلا من أن يكون فيه شبهة الربا ،ومن المعلوم أن شبهة الربا في حكم الربا كما بسطه الفقهاء في باب القرض والبيع ،
অপ্রকাশ্য শর্তারোপঃ
যা আমাদের দেশে প্রচলিত,
লোকজন বন্ধক চুক্তির সময় ফায়দা গ্রহণের শর্ত উল্লেখ করে না।কিন্তু বন্ধক চুক্তির উদ্দেশ্য বা নিয়ত ই থাকে উক্ত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ করা।যদি ফায়দা গ্রহণ না করা যায়,তাহলে বন্ধকগ্রহীতা কখনো ঋণ দেবে না।
এমনকি যদি বন্ধকগ্রহীতা ঋণ দিয়ে দেয়,এবং ঘটনাক্রমে অন্যকোনো বৈঠকে বন্ধকদাতা বন্ধকগ্রহীতাকে ফায়দা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় বা প্রথমে অনুমতি দিয়ে থাকে এবং পরবর্তিতে অনুমিত ছিনিয়ে নেয়,তাহলে বন্ধকগ্রহীতা অত্যন্ত রাগান্বিত হবে এবং সে তার ঋণকে তৎক্ষনাৎ উসূল করার চেষ্টা করবে।
সুতরাং যদিও তাদের কথাবার্তার প্রাথমিক পর্যায়ে শর্তের আলোচনা নেই কিন্তু বন্ধকের মাধ্যমে আসল উদ্দেশ্য-ই হচ্ছে ফায়দা গ্রহণ।
সর্বজন স্বীকৃত যে,প্রসিদ্ধ জিনিষ শর্তের মতই হয়ে থাকে।
(যেমন বিশিষ্ট উসূলবিদ ইবনে নুজাইম বলেছেন)
এত্থেকে অনেক শাখাপ্রশাখা বের হয়,
অর্থাৎ বাহ্যিক শর্ত যেভাবে হারাম ঠিকতেমনিভাবে গোপন শর্তারোপও হারাম।
যদি তাকে সরাসরি সুদ বলা নাও যায়,তবে কমপক্ষে তাতে সুদের সন্দেহ রয়েছে।
সুদ যেভাবে হারাম ঠিকতেমনিভাবে সুদের সন্দেহজনক জিনিষ ও হারাম।যেমন ফুকাহায়ে কিরামগণ ব্যবস্যা এবং ঋণ অধ্যায়সমূহে এ বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করছেন।
وصورة الإذن الغير المشروط أن لا يشترط المرتهن ذالك في نفس العقد ولا يدفع الدين بهذا الشرط ولا ينوي أيضا بدفع الدين اباحته وانه لولاه لما دفع بل قصد مجرد الحبس والتوثق ،
শর্ত ব্যতীত বন্ধকদাতা কর্তৃক বন্ধকগ্রহীতাকে ফায়দা গ্রহণের অনুমতির নমুনারূপ হলোঃ-
বন্ধক চুক্তির সময় বন্ধকগ্রহীতা ফায়দা গ্রহণের কোনোরূপ চুক্তি করবেনা।এবং ফায়দা গ্রহণের উদ্দেশ্যে উক্ত ঋণও দিবে না।এবং ঋণ প্রদানের সময় বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়েদা গ্রহণ যে বৈধ তারও নিয়্যাতও সে করবে না।
এবং ফায়দা গ্রহণের বৈধতা না থাকলে ঋণ দিবেনা বলে এমন নিয়্যাত ও করবে না।বরং বন্ধককৃত জিনিষকে শুধুমাত্র নিজ দায়িত্বে হস্তগত রাখার নিয়্যাত করবে।
وهذا لا شبهة في جوازه ،فإنه ليس فيه ربا ولا شبهة الربا ،فإن كان الانتفاع في هذه الصورة مورثا إلي شيئ فليس الا هو شبهة شبهة الربا ،وهي غير معتبرة ،
هذا كما إذا أذن رجل لغيره في الانتفاع بملكه بطيب خاطره من غير رهنه فإنه يجوز بلا شبهة ،فكذا إذا اجاز المالك وهو الراهن الانتفاع بملكه وهو المرهون للمرتهن بطيب خاطره يجوز للمرتهن ذالك ،لأنه أذن علي حدة ليس بشرط في الرهن ،لا حقيقية ولا عرفا ،لكن مع ذلك الانتفاع خلاف الأولى ،والاحتراز عنه أولى ،
فالإحتراز في هذه الصورة تقوى،والإنتفاع فتوى،
এ পদ্ধতির বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রকার মতবিরোধ নেই।কেননা তা সুদও নয়,এবং তাতে সুদের সন্দেহও নেই।যদিও তাতে সন্দেহ জাগে কিন্তু তা সুদের সন্দেহের সন্দেহ বলে পরিগণিত হবে।এতে অবশ্য কোনো সমস্যা নেই।
বন্ধকের উক্ত পদ্ধতি সেই (বন্ধক ব্যতীত)
সাধারণ বৈধ পদ্ধতির মত যেখানে একজন মানুষ অন্য কাউকে নিজ সন্তুষ্টচিত্তে কোনো বস্তু থেকে ফায়দা গ্রহণের অনুমতি প্রদাণ করলো,যা নিঃসন্দেহে বৈধ।
ঠিকতেনিভাবে যদি বন্ধকদাতা বন্ধকগ্রহীতাকে বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণের অনুমিত দিয়ে দেয় তাহলে তাও বৈধ হবে।
কেননা এক্ষেত্রে তা পৃথক অনুমতি হবে,বন্ধক চুক্তির কোনো শর্ত বলে পরিগণিত হবে না।
না হাক্বীকি(প্রকাশ্য) শর্ত বলে পরিগণিত হবে না উরফি(অপ্রকাশ্য) হিসেবে।
তবে এর পরেও উপরোক্ত অবস্থায় ফায়দা গ্রহণ না করা উত্তম।এত্থেকে বেচে থাকা উত্তম।ফায়েদা গ্রহণ থেকে বেছে থাকা হল তাকওয়া এবং গ্রহণ করা হল ফাতাওয়া।
وهذه الصورة يعز وجودفهي في زماننا و يندر،ولا يرتكبها الا الأقل الأندر فهي في زماننا كالكبريت الأحمر والشائع في زماننا هو المشروط حقيقية والمشروط حكما ،
উপরোক্ত বৈধ পদ্ধতি পাওয়া যাওয়া আজ বড়ই দুস্কর,এবং নিতান্তই কম।লাল কিবরিত পদার্থের ন্যায় তা আজ আর পাওয়া যাবে না।
আমাদের সমাজে প্রচলিত বন্ধক পদ্ধতিতে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য শর্ত নিয়োজিত রয়েছে।
وقد اغترَّ كثير من علماء عصرنا ومن سبقنا بظاهر عبارات الفقهاء أنه يجوز الانتفاع للمرتهن بالاذن فافتوا به مطلقا من دون ان يفرقوا بين المشروط وغيره ،ومن دون ان يتأملوا في ان المعروف كالمشروط فضلوا و اضلوا ،
وقد التزمت انا من مدة مديدة أني كلما سئلت عن الانتفاع بالاذن أجبت بالكراهة، لعلمى منهم ان الإذن عندهم يكون مشروطا حقيقية أو عرفا ،والأذن المجرد عن شوب الاشتراط الحقيقي العرفي نادر قطعاً،
আজ আমাদের সময়কার অনেকেই ফুকাহায়ে কেরামগণের প্রকাশ্য ইবারত সমূহের দ্বারা ধোকাপ্রাপ্ত হচ্ছেন।
এভাবে যে তারা মনে করেন বন্ধকদাতার অনুমতিতে বন্ধকগ্রহীতার জন্য বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ জায়েয।
তারা শর্তারোপ হওয়া না হওয়ার মধ্যকার কোনো পৃথকতা বোঝেন না।এবং প্রসিদ্ধ ফেকহী উসূল “প্রসিদ্ধি শর্তারোপের মত”এ কোনোপ্রকার চিন্তা গবেষনা করেন না।বরং তারা অনায়াসেই সর্বক্ষেত্রে বৈধতার ফতোয়া দিচ্ছেন।
এক্ষেত্রে তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হচ্ছেন এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করছেন।
বন্ধকদাতার অনুমিত সাপেক্ষে বন্ধককৃত জিনিষ থেকে ফায়দা গ্রহণ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলে,আমি বরাবরই মাকরুহে তাহরীমির ফতোয়া দিয়ে আসছি।
মানুষদের হাল-সমাচার জেনে যে, তাদের মধ্যকার বন্ধক পদ্ধতিকে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যে শর্তারোপ অবশ্যই রয়েছে।
প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে শর্তারোপ ব্যতীত শুধুমাত্র ফায়দা গ্রহণের অনুমিত আজকাল নেই বললেও চলে।
আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটি মূলত ঋণ প্রদান করে বন্ধকি জমি ভোগ করার একটি অবৈধ ছুতা।
কারণ এক্ষেত্রে আলাদাভাবে ইজারা চুক্তি করা হয় না; বরং জমি ভোগ করার শর্তেই ঋণ দেওয়া হয় এবং ঋণের সুবিধা পাওয়ার কারণেই জমির মালিক নামমাত্র মূল্যে ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং উপরোল্লেখিত দুটি কারবারই নাজায়েয।
وأما الإجارة فالمستأجر إن كان هو الراهن فهي باطلة،………….. وإن كان هو المرتهن وجدد القبض للإجارة أو أجنبيا بمباشرة أحدهما العقد بإذن الآخر بطل الرهن والأجرة للراهن وولاية القبض للعاقد ولا يعود رهنا إلا بالاستئناف.
বন্ধককৃত জিনিষকে ভাড়ায় খাটাতে ভাড়া প্রদানকারী যদি বন্ধকদাতাই হয়ে থাকেন,
তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
আর যদি ভাড়া প্রদানকারী বন্ধকগ্রহীতা থাকেন, এবং ভাড়া প্রদানের নিমিত্তে ক্ববযাকে নতুনত্ব করে নেন,অথবা কোনো আজনবী তাদের একজনের উপস্থিতি ও অন্যজনের অনুমিত সাপেক্ষে ভাড়া প্রদান করেন, তাহলে এমতাবস্থায় বন্ধকচুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।ভাড়া বাবৎ প্রদত্ত টাকা বন্ধকদাতাই পাবে।এবং ভাড়ায় গ্রহণকারীর জন্য উক্ত জিনিষে হস্তক্ষেপ করার শরয়ী অধিকার থাকবে।এখন আর তাতে বন্ধকচুক্তি থাকবে না।এক্ষেত্রে বন্ধকগ্রহীতা নিজ ঋণকে উসুল করে নিবে।কেননা বন্ধক চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে।
রদ্দুল মুহতার-৬/৫১১
ولو آجره المرتهن بإذن الراهن فالأجر للراهن، وبطل الرهن،
যদি বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকদাতার অনুমতি সাপেক্ষে বন্ধককৃত জিনিষকে কোথাও ভাড়ায় প্রদান করে,তাহলে প্রদত্ত ভাড়া বন্ধকদাতাই পাবে,এবং বন্ধকচুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-৫/৪৭৮
وكذلك لو استأجره المرتهن صحت الإجارة، وبطل الرهن
যদি বন্ধকগ্রহীতা বন্ধককৃত জিনিষকে ভাড়ায় নিয়ে নেয়,তাহলে ভাড়া নেওয়া বিশুদ্ধ হবে এবং বন্ধকচুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-৫/৪৬৫
সু-প্রিয় পাঠকবর্গ! উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা বুঝতে পারলাম,বন্ধকচুক্তিতে নতুনভাবে ইজারাচুক্তি করলে পুর্বের বন্ধকচুক্তি বাক্বী থাকবে না।বরং বাতিল হয়ে যাবে।
বিকল্প বৈধ পদ্ধতিঃ
(১)
উক্ত লেনদেনকে বৈধভাবে করতে চাইলে শুরু থেকেই বন্ধকি চুক্তি না করে ভাড়া বা লীজ চুক্তি করতে হবে।
যার বিবরণ হল, জমির মালিক জমি ভাড়া দিবে। তার যত টাকা প্রয়োজন সেজন্য যত বছর ভাড়া দিতে হয় একত্রে তত বছরের জন্য ভাড়া দিবে। যেমন-এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া ৫ হাজার টাকা। মালিকের ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাহলে সে ৪ বছরের জন্য জমি ভাড়া দিবে। এক্ষেত্রে অগ্রিম ২০ হাজার টাকা নিয়ে নিবে। এক্ষেত্রে জমির ভাড়া স্থানীয় ভাড়া থেকে সামান্য কম বেশিও হতে পারে। এরপর ভাড়ার মেয়াদ শেষ হলে অর্থ দাতা জমি ফেরত দিবে, কিন্তু প্রদেয় টাকা ফেরত পাবে না। অবশ্য সময়ের আগে ফেরত দিলে যে কয়দিন ভাড়ায় ছিল সে পরিমাণ ভাড়া কর্তন করে অবশিষ্ট টাকা ভাড়াটিয়া ফেরত পাবে।
(২)
বৈধ দ্বিতীয় বিকল্প পদ্ধতি
বয় বিল ওয়াফাঃ
অর্থ্যাৎ জমিকে প্রথমে বিক্রয় করা হবে। তারপর বিক্রেতা ক্রেতাকে বলবে যখন আমার কাছে টাকা হবে তখন আপনাকে উক্ত জমি বিক্রি করতে হবে।এবং তাকে বয়য়ে আমানতও বলা হয়ে থাকে।
এভাবে হলে উক্ত লেনদেন বৈধ হবে।
যেমন ফাতাওয়ায়ে কাযীখানে বর্ণিত আছে,
والصحيح ان العقد الذي جرى بينهما ان كان بلفظ البيع لا يكون رهنا ثم ينظر إن ذكرا شرط الفسخ في البيع فسد البيع ،وإن لم يذكرا ذلك في البيع وتلفظا بلفظة البيع بشرط الوفاء وتلفظا بالبيع الجائر ،
وعندهما هذا البيع عبارة عن عقد غير لازم فكذلك ،
وإن ذكر البيع من غير شرط ثم ذكر الشرط على وجه المواعدة جاز البيع ويلزمه الوفاء بالوعد،لأن المواعدة قد تكون لازمة فتجعل لازمة لحاجة الناس ،
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ার টীকায় লিখিত ফাতাওয়া কাযীখান-২/১৬৫;
তথ্যসূত্রঃ-
মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৮/২৪৪-২৪৫;
শরহু মুখতাসারিত তহাবী ৩/১৪৯;
রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২;
বাদায়েউস সানায়ে ৫/২১২;
শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসী ৩/১৯৬-১৯৭;
ইলাউস সুনান ১৮/৬৪
ফাতাওয়া উসমানী ৩/৪২২;
(মাকতাবাতু মা’রিফুল কুরআন-করাছী)
মাসিক আল-কাউছার থেকে চয়নকৃত কিছু অংশও তাতে রয়েছে।
কিতাবুন নাওয়াযিল,১৭/১২৯
ফাতাওয়া কাযীখান-২/১৬৫;
আল্লাহ-ই ভালো জানেন।
লেখক : মুফতী ইমদাদুল হক, সাধারণ সম্পাদক, ইসলামিক রিসার্চ কাউন্সিল বাংলাদেশ
প্রশ্ন: যদি বন্ধকদাতার সঙ্গে ‘বাই বিল ওয়াফা’ চুক্তি করে অর্থাৎ বন্ধকগ্রহীতার কাছে ঋণী ব্যক্তি তার জমিটি বিক্রি করে দেবে এই ওয়াদার ওপর যে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা আবার জমিটি তার কাছে বিক্রি করে দেবে তাহলে বন্ধকগ্রহীতার মালিকানায় যত দিন থাকবে সে জমির মালিক হিসেবে তা ভোগ করতে পারবে। এখন বন্ধকগ্রহীতা মালিক হিসাবে যদি জমিটি বন্ধক দাতার কাছে ভাড়া দেয় এবং বন্ধকদাতা জমিটি ভোগ করতে থাকে এবং বন্ধক গ্রহিতা ভাড়ার টাকা নিতে থাকে যতদিন জমিটি পুনরায় বন্ধক দাতা ঋণের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দিয়ে ক্রয় না করে ততদিন, তাহলে কি বন্ধকগ্রহীতার এই ঋণের সম্পূর্ণ টাকাটা ফেরত নেওয়াতে কোন সমস্যা আছে?
উত্তর লিখনে: মুফতী ইমদাদুল হক
না।তবে বাই বিল ওয়াফা কে যেহেতু কেউ কেউ না করেন,তাই সতর্কতামূলক এমনটা না করাই উত্তম
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….
✍ জমি বন্ধক:
===========================
বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় বহুল প্রচলিত লেনদেন হল, জমি বন্ধক রীতি। কারো টাকার প্রয়োজন হলে কেউ সাধারণত করজে হাসানা দেয় না। বরং জমি বন্ধক প্রদানের শর্তে ঋণ প্রদান করে। ঋণদাতা বা বন্ধক গ্রহীতা বন্ধককৃত জমি ভোগ করে এবং মেয়াদান্তে মালিক পুরো টাকা ফেরত দিয়ে জমি বুঝে নেয়। বিভিন্ন এলাকায় একে ‘জমি কট দেওয়া’ও বলে। আবার কেউ ‘জমি খায়খালাসি দেওয়া’ও বলে।
*
✍ বিধান:
ইসলামে ঋণ প্রদান করে ঋণ প্রদানের কারণে ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণের অতিরিক্ত যে কোন কিছু গ্রহণ করা সুদ। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-
كل قرض جر نفعا فهو ربا
“যেসব ঋণ ঋণ প্রদানের কারণে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি থেকে কোন ধরনের উপকার বয়ে নিয়ে আসে সেটা সুদ হবে”-
[সূত্রঃ আল মাতালিবুল আলীয়া বি-যাওয়ায়িদি মাসানিদি ছামানিয়া, ৪/৩৮১, হাঃ ১৪৮৪;সুনান আল কুবরা,বাইহাক্বি ৫/৫৭৩ হাঃ১০৯৩৩;বাগিয়্যাতুল বাহেস আ’ন যাওয়ায়িদিল মুসনাদিল হারেস ১/৫০০০হাঃ৪৩৭আল মুগনী আনিল হিফজি ওয়াল কিতাব পৃষ্টাঃ৮১; -হাদিসটির সনদ যঈফ হলেও সকল ইমাম ও আহলুল ইলম গন এর মা’নাকে সহীহ বলেছেন এবং অনেক ইমাম গন এর দ্বারা দলিল প্রদান করেছেন,এছাড়া ও এ হাদিসের যঈফ শাহেদ ও আছে যা এ হাদিসের সনদকে শক্তি শালী করে]
*
উক্ত হাদীসে ‘নাফউন’ শব্দের অর্থ benefit, helpfulness বাংলায় বলে ‘উপকার, লাভ, মুনাফা ইত্যাদি’। উক্ত ‘বেনিফিট’ ব্যাপক। চাই তা অর্থ দ্বারা হোক বা অন্য যে কোন উপায়ে অর্জিত হোক-সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তদ্রুপ চাই তা চুক্তিতে শর্তযুক্ত হোক বা সামাজিক প্রথা ও রীতির ভিত্তিতে শর্তযুক্ত হোক-সবটাই উদ্দেশ্য।
উক্ত হাদীসে নিষিদ্ধ বেনিফিট হল করজদাতার জন্য। গ্রহীতার জন্য নয়। কারণ, সে তো করজ দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্যই করজ গ্রহণ করেছে।
*
**জাবির (রাদ্বি:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম) কয়েক বছরের জন্য জমি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন।’
[সহীহ মুসলিম (বাবু কিরাইল আরদ): হাদিস নম্বর : ৩৮২২]
বোঝা গেল, সমাজে প্রচলিত ‘রেহান’ কোনো শরিয়তসম্মত ক্রয়-বিক্রয় নয়।
*
✍রাহন বা ঋনের মূলনিতীঃ
শরিয়তের পরিভাষায় ‘রাহন’ হলো কোনো দাবির বিপরীতে কোনো বস্তুকে এমনভাবে আটক রাখা, যাতে আটককৃত বস্তু দিয়ে দাবি বা অধিকার বা পাওনা আদায় সম্ভব হয়। যেমন- ঋণ। সোজা কথায়, রেহান অর্থ বন্ধক।
*
মোট কথা বন্ধক রাখার বিষয়টি ইসলামি শরিয়তে অনুমোদিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোনো লেখক না পাও তবে হস্তান্তরকৃত/অধিকৃত/আয়ত্তাধীন বন্ধকী বস্তু নিজ দখলে রাখবে।’ (সূরা বাকারাহ : ২৮৩)
সূরা মুদ্দাচ্ছিরের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ (রাহিনাহ)।’
**
রাসূলুল্লাহ(ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম) নিজে এক ইহুদি থেকে বাকিতে কিছু খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং সেই দেনার গ্যারান্টি হিসেবে তাঁর বর্মটি ইহুদির কাছে রেহান (বন্ধক) রেখেছিলেন।
*
বুরহানুদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুবকর আল-ফারগানি আল-মারগিনানি (রহ:) তার আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে বলেছেন, ‘রেহান (বন্ধক) রাখা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। রেহান (বন্ধক) হচ্ছে নিজের পাওনা উসুল নিশ্চিত করার নিমিত্তে সম্পাদিত একটি চুক্তি।’
*
ইমাম শাফেয়ি (রহ:) বলেছেন, বন্ধকী বস্তু (রেহান) বন্ধক গ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ থাকে।
আল-মারগিনানি (রহ:) তাঁর আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে আরো বলেছেন, ‘বন্ধক’ (রেহান) গ্রহীতা ব্যক্তির জন্য জায়েজ নেই বন্ধকের (রেহান) মাল দিয়ে উপকৃত হওয়া। সেবা নেয়া, বসবাস করা বা পরিধান করা কোনোটাই জায়েজ নয়। রেহান রাখা হয় শুধু নিজের পাওনা আদায় করার জন্য।
*
বলা বাহুল্য, কট প্রথায় জমির বেনিফিট-টা মূল ঋণের অতিরিক্ত। তাই তা সুদ। শরীয়াহর ব্যাপারে অসচেতনতার কারণে কট প্রচলন আজ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
*
বন্ধককে কেন্দ্র করে সুদের লেনদেন গ্রামে-গঞ্জে আরো বহুভাবে হয়ে থাকে। একটি মূলনীতি মনে রাখবেন, ঋণের বিপরীতে বন্ধক গ্রহণ করে যে কোন উপায়ে সেটা থেকে গ্রহীতা কোনরূপ উপকার হাসিল করলে সেটাই সুদ বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।
*
✍বিকল্প বা জায়েয সুরতঃ
কট প্রথার বিকল্প হল, ঋণদাতা জমি লীজ নিয়ে তা থেকে উপকৃত হবে। তবে এর জন্য শর্ত হল-
ক.করজ ও লীজ চুক্তিদুটি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্রভাবে হতে হবে।
খ.একটি চুক্তির সাথে আরেকটি চুক্তি কোনভাবেই শর্তযুক্ত হবে না। সুতরাং করজ প্রদানের পর করজগ্রহীতা তার জমি লীজ দিতে অস্বীকার করলে তাকে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। কেবল সঠিক অর্থে জমি বা অন্য কিছু বন্ধক প্রদানের জন্য বলতে পারবে।
গ.জমির রেন্ট উরফ অনুযায়ী ন্যায়সঙ্গত হতে হবে।
*
✍প্রশ্নঃ জমি বর্গা চাষ বা ইজারা দেওয়ার শরী‘আতসম্মত পন্থা কি কি?
জমি বর্গা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত নিতী গুলো মেনে বর্গা দেওয়া যাবে-
রাফে‘ বিন খাদীজ (রাঃ) বলেন, আমার দুই চাচা নবী করীম (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম)-এর যুগে জমি বর্গা দিতেন এভাবে যে, নালার পাশে যে শস্য হবে তা তাদের অথবা জমির মালিক (শস্য নেয়ার জন্য) কিছু জমি পৃথক করে দিতেন। নবী করীম (ছাঃ) এরূপ করতে নিষেধ করলেন।
হানযালা (রহঃ) বলেন, আমি রাফে‘ বিন খাদীজ (রাঃ)-কে বললাম, স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে জমির ভাড়া দেয়া যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোন বাধা নেই (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৭৪)।
>
জমিতে উৎপাদিত শস্য পারস্পরিক ভাগাভাগির চুক্তিতে বর্গা দেওয়া শরী‘আত সম্মত।
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম) খায়বারের জমিতে উৎপাদিত ফল-ফসল অর্ধেক প্রদানের শর্তে বর্গা দিয়েছিলেন (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৯৭২)।
>
মুহাম্মদ ইবন কাছীর (রহঃ) ……….. ইবন উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ কৃষি জমি বর্গা দেয়াকে আমি খারাপ মনে করতাম না। এরপর আমি রাফি ইবন খাদীজ (রাঃ)-কে এরূপ বলতে শুনি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তখন আমি তাঊসের নিকট এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেনঃ ইবন আব্বাস (রাঃ) আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরুপ করতে নিষেধ করেন নি। তবে তিনি বলেছেনঃ যদি তোমাদের কেউ তার জমি কৃষির জন্য বর্গা দেয়, তবে তা ঐ ব্যবস্থার চাইতে উত্তম যে, কাউকে তা নিদিষ্ট টাকার বিনিময়ে দেবে।
(সুনান আবু দাউদঃ৩৩৫৬-কিতাবুল বুয়ু,পরিচ্ছদঃ কৃষি জমি বর্গা দেওয়া-হাদিসটি কেউ কেউ যঈফ বলেছেন)
>
আবূ বাকর ইবন আবী শায়বা (রহঃ) ……….. উরওয়া ইবন যুবায়র (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যায়দ ইবন ছাবিত (রাঃ) বলেছেনঃ আল্লাহ্ রাফি ইবন খাদীজ (রাঃ)-কে ক্ষমা করুন! আল্লাহ্র শপথ! আমি এ হাদীছ সম্পর্কে তার চাইতে অধিক অবহিত। ঘটমাটি এরূপঃ একদা দু’জন আনসার সাহাবী পরস্পর মারামারি করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমতে উপস্থিত হয়। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের অবস্থা যদি এই হয়, তবে তোমরা জমি বর্গা দেবে না। মুসাদ্দিদ (রহঃ) এরূপ অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, রাফি ইবন খাদীজ (রাঃ) শুধু এতটুকু শোনেনঃ তোমরা জমি বর্গা দেবে না।
(সুনান আবু দাউদঃ৩৩৫৭-কিতাবুল বুয়ু,পরিচ্ছদঃ কৃষি জমি বর্গা দেওয়া-হাদিসটি সহীহ)
*
✍প্রশ্নঃআমাদের দেশে একটি প্রচলন আছে, আবাদি জমি বন্ধক রেখে টাকা নেওয়া। যেমন : আপনার ৫০ শতক জমি ১ লক্ষ টাকার বিনিময়ে আমার নিকট বন্ধক রাখলেন, সেই জমি টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত আমার জন্য ভোগ করা যায়েজ হবে কিনা??
*
উত্তরঃ
উক্ত চুক্তিটি জায়েজ হবার দু’টি সূরত রয়েছে। এ দু’টি সূরত অনুসরণ করলে এ চুক্তি জায়েজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
✍**১ম সূরত**
যিনি জমি নিবেন তিনি এ হিসেবে চুক্তি করবেন যে, তিনি জমিটি ভাড়া নিচ্ছেন। নামমাত্র কিছু মূল্য মাসিক ভাড়া হিসেবে নির্দিষ্ট করে নিবে। যেমন ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা। আর অগ্রিম ভাড়া হিসেবে প্রদান করবে ১/২ লাখ টাকা।
তারপর যেদিন জমিনটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন আগের নির্ধারণকৃত নামমাত্র ভাড়ার টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দেবে জমিনটি ভোগদখলকারী তথা জমির ভাড়াটিয়াকে।
যেমন-
আব্দুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আব্দুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আব্দুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায় আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে ভাড়া দিবে। মাসিক ভাড়া নির্দিষ্ট করে নিল কথার কথা ৫০ টাকা। যতদিন আব্দুর রহমান জমিটি রাখবে ততদিন মাসিক ৫০ টাকা করে ভাড়া প্রদান করবে। মাসিক ভাড়া অগ্রিম হিসেবে আব্দুর রহমান ৫ লাখ আব্দুল্লাহকে দিয়ে দিবে। ফলে জমিটির ভাড়াটিয়া হিসেবে আব্দুর রহমান ভোগদখল করতে থাকবে। আর আব্দুল্লাহ টাকাটি খরচ করতে পারবে।
তারপর যেদিন আব্দুল্লাহ তার জমিটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন বিগত দিনের মাসিক ভাড়া বাদ দিয়ে বাকি টাকা প্রদান করে জমিটি ফেরত নিয়ে নেবে। কথার কথা যদি ৫ মাস পর ফেরত নিতে চায়, তাহলে ৫ মাসের ভাড়া ২৫০ টাকা রেখে বাকি এক লাখ নিরান্নব্বই হাজার সাতশত পঞ্চাশ টাকা প্রদান করে আব্দুল্লাহ সাহেব তার জমিটি ফেরত নিয়ে নিবেন। {জাদীদ ফিক্বহী মাসায়েল-১/১৪৭-১৪৮, মালে হারাম আওর উসকে মাসারেফ ওয়া আহকাম-৮৫}
وَأَمَّا زَكَاةُ الْأُجْرَةِ الْمُعَجَّلَةِ عَنْ سِنِينَ فِي الْإِجَارَةِ الطَّوِيلَةِ الَّتِي يَفْعَلُهَا بَعْضُ النَّاسِ عُقُودًا وَيَشْتَرِطُونَ الْخِيَارَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فِي رَأْسِ كُلِّ شَهْرٍ فَتَجِبُ عَلَى الْآجِرِ لِأَنَّهُ مَلَكَهَا بِالْقَبْضِ وَعِنْدَ الِانْفِسَاخِ لَا يَجِبُ عَلَيْهِ رَدُّ عَيْنِ الْمَقْبُوضِ بَلْ قَدْرُهُ فَكَانَ كَدَيْنٍ لَحِقَهُ بَعْدَ الْحَوْلِ
(সূত্রঃফতহূল কদ্বীর,কিতাবুয যাকাত ২/১৭৪)
✍**২য় সূরত**
দু’টি চুক্তি সম্পাদন করবে। প্রথমে ক্রয় বিক্রয় চুক্তি। তারপর আলাদা আরেকটি চুক্তি নামায় যেদিন টাকা পরিশোধ করতে পারবে সেদিন জমিটি প্রথম জমির মালিক ক্রয় নিয়ে নিয়ে যাবে আর বর্তমান মালিক তা বিক্রি করে দিবে মর্মে চুক্তি সম্পাদিত করবে।
যেমন-
আব্দুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আব্দুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আব্দুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায় আব্দুল্লাহ তার জমিটি ৫ লাখ টাকায় আব্দুর রহমানের কাছে বিক্রি করে টাকা গ্রহণ করে নিবে। এভাবে আব্দুল্লাহ টাকার মালিক ও আব্দুর রহমান জমিটির ভোগ দখলের মালিক হয়ে যাবে।
তারপর ভিন্ন আরেকটি চুক্তি সম্পাদন করবে। যাতে লিখবে যে, যেদিন আব্দুল্লাহ ৫ লাখ টাকা দিতে পারবে, সেদিন আব্দুর রহমান জমিটি আব্দুল্লাহের কাছে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে দিবে।
এভাবে ভিন্ন দু’টি চুক্তি সম্পাদিত করলে টাকা খরচ করা এবং জমিটি ভোগ দখলের মাঝে অবৈধতার কোন কিছুই বাকি থাকবে না।
لو ذكرا البيع بلا شرط ثم ذكرا الشرط على وجه العقد جاز البيع ولزم الوفاء بالوعد، إذ المواعيد قد تكون لازمة فيجعل لازما لحاجة الناس تبايعا بلا ذكر شرط الوفاء ثم شرطاه يكون بيع الوفاء؛
(সূত্রঃবাহরুর রায়েক্ব ,কিতাবুল বুয়ু’-বাবু খিয়ারিশ শরত ৬/৮;রদ্দুল মুহতার,কিতাবুল বুয়ু’ ৭/২৮১)
এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত দেখুন-
(মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৮/২৪৪-২৪৫; শরহু মুখতাসারিত তহাবী ৩/১৪৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২; বাদায়েউস সানায়ে ৫/২১২; শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসী ৩/১৯৬-১৯৭; ইলাউস সুনান ১৮/৬৪; ইরওয়াউল গালীল হা/১৩৯৭)
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….
আমাদের দেশে জমিজমা চাষবাস ও এসংক্রান্ত অনেক ধরনের লেনদেন চলে। এগুলোর শরয়ি বিধানাবলিও ইসলামী ফিকাহ ও ফাতাওয়ার কিতাবগুলোয় উল্লেখ রয়েছে। আমরা এখানে বিশেষ কিছু মাসআলা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
বর্গাচাষ : এটা হচ্ছে একজনের জমিতে অপরজন শ্রম দিয়ে চাষ করে উভয়ে পূর্বচুক্তি অনুসারে উৎপাদিত ফসল সমান অর্ধেক করে বা কমবেশি ভাগ করে নেবে। এ ক্ষেত্রে উৎপাদনের প্রাসঙ্গিক অন্যান্য খরচ ও ব্যয়ভারের শরিয়তসম্মত তিনটি পদ্ধতির যেকোনো একটি গ্রহণ করা যেতে পারে।
১. জমি এবং বীজ একজন বহন করবে আর চাষাবাদের যাবতীয় খরচ দ্বিতীয় জন বহন করবে।
২. শুধু জমি একজনের আর চাষাবাদের জন্য যাবতীয় খরচ দ্বিতীয় জন আঞ্জাম দেবে।
৩. জমি এবং বীজসহ হালের জন্য গরু অথবা মেশিনের খরচ একজন বহন করবে আর দ্বিতীয় জন শুধু কাজ করবে।
এই তিনটি ছাড়া অন্য পদ্ধতি শরিয়তসম্মত নয়। (ফাতহুল কাদির : ৯/৪৭৬)
জমি বন্ধক রাখার প্রচলিত পদ্ধতি
বন্ধক রাখা হয় ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তাস্বরূপ। এতে ঋণদাতা নিশ্চিত থাকেন যে ঋণ আদায় না করলেও বন্ধককৃত বস্তু থেকে আদায় করে নেওয়া যাবে। পবিত্র কোরআনেও এর নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর যদি তোমরা সফরে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তাহলে হস্তান্তরিত বন্ধক রাখবে। আর যদি তোমরা একে অপরকে বিশ্বস্ত মনে করো, তবে যাকে বিশ্বস্ত মনে করা হয়, সে যেন স্বীয় আমানত আদায় করে এবং নিজ রব আল্লাহকে ভয় করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮৩)
বন্ধককৃত বস্তু বন্ধকগ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ। বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতার কোনো ফায়দা হাসিল করা নাজায়েজ ও হারাম। এমনকি বন্ধকদাতা এর অনুমতি দিলেও পারবে না। কারণ বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা কোনো ধরনের ফায়দা উপভোগ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত, যা হারাম। (বাদায়েউস সানায়ে : ৬/১৪৬)
ইবনে সিরিন (রহ.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক লোক সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে জিজ্ঞেস করল, এক ব্যক্তি আমার কাছে একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে, তা আমি আরোহণের কাজে ব্যবহার করেছি। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তুমি আরোহণের মাধ্যমে এর থেকে যে উপকার লাভ করেছ তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৫০৭১)
বিখ্যাত তাবেয়ি ইমাম কাজি শুরাইহ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সুদ পান করা কিভাবে হয়ে থাকে? তিনি বলেন, বন্ধকগ্রহীতা বন্ধকি গাভির দুধ পান করা সুদ পানের অন্তর্ভুক্ত। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদিস : ১৫০৬৯)
প্রচলিত জমি বন্ধক পদ্ধতির বৈধ বিকল্প
১. বন্ধকি জমি থেকে বন্ধকগ্রহীতা উপকৃত হতে চাইলে এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে যে বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা পদ্ধতি অবলম্বন করবে। অর্থাৎ যত দিন পর্যন্ত ঋণের টাকা শোধ না হয় ঋণদাতা জমিটি ইজারা পদ্ধতিতে তা ভোগ করবে এবং তার ন্যায্য ভাড়াও মালিককে আদায় করবে। এ ক্ষেত্রে ঋণ ও ইজারাচুক্তি দুটি ভিন্ন হতে হবে, দুটি চুক্তিকে মিলিয়ে একটি অপরটির ওপর শর্তযুক্ত হতে পারবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ৫/৪৬৫, ইমদাদুল আহকাম ৩/৫১৮)
২. অথবা সে বন্ধকদাতার সঙ্গে ‘বাই বিল ওয়াফা’ চুক্তি করবে। অর্থাৎ বন্ধকগ্রহীতার কাছে ঋণী ব্যক্তি তার জমিটি বিক্রি করে দেবে এই ওয়াদার ওপর যে ঋণ পরিশোধ হওয়ার পর বন্ধকগ্রহীতা আবার জমিটি তার কাছে বিক্রি করে দেবে। এ ক্ষেত্রে বন্ধকগ্রহীতার মালিকানায় যত দিন থাকবে সে তা মালিক হিসেবে ভোগ করতে পারবে। (ইমদাদুল আহকাম : ৩/৫১১)
ইজারা কী?
স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে জমি ইজারা তথা ভাড়া দেওয়া বৈধ। ভাড়া নিয়ে যেকোনো বা এমন বৈধ কাজে লাগানো জায়েজ হবে যার কারণে জমির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না হয়। জমির মালিক যদি ইজারাদারকে সাধারণভাবে সব ধরনের ফসল চাষ করার অনুমতি দিয়ে দেয়, তাহলে সে যেকোনো শস্য চাষ করতে পারবে। (হেদায়া ৩/২৯৬)। গাছসহ বাগান ইজারা দেওয়া শুদ্ধ নয়। (রদ্দুল মুহতার ৫/৫)
গাছের ফল বের হওয়ার আগে ফল বিক্রি বৈধ নয়। বরং ফলের মুকুল বের হওয়ার পর বিক্রি বৈধ হবে। অনুরূপ অগ্রিম কয়েক বছরের জন্য বাগানের ফল বিক্রি বৈধ নয়।
তবে এর একটি বৈধ পদ্ধতি এভাবে হতে পারে যে ফলগাছ বিক্রি করে দেবে এবং মালিক বিক্রীত গাছ তার বাগানে রাখার জন্য ক্রেতাকে অনুমতি দিয়ে দেবে। অথবা গাছ বিক্রির পর ক্রেতা মালিক থেকে বাগান ভাড়া নেবে। পরবর্তীকালে ইচ্ছা করলে ফলের মৌসুম শেষ হলে কিংবা কয়েক বছর পর আবার ওই মূল্যে বা এর চেয়ে কমবেশি দিয়ে গাছগুলো মালিকের কাছে বিক্রি করে দেবে। (রদ্দুল মুহতার ৫/২০, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/২৬৭)
লেখক : ফতোয়া গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকা।
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….
প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় জমি বন্ধকের দুটি প্রচলন রয়েছে :
এক. বন্ধকদাতা বন্ধক গ্রহীতার নিকট থেকে নির্ধারিত পরিমাণ টাকা গ্রহণ করে আর বন্ধকগ্রহীতা জমি ভোগ করতে থাকে। যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন জমি হস্তান্তর করে।
দুই. এটিও উপরের মতোই। তবে পার্থক্য হল, এক্ষেত্রে যখন টাকা ফিরিয়ে দেয় তখন বছর হিসাব করে বন্ধকগ্রহীতা কিছু টাকা কম নেয়। যেমন-কেউ এক কাঠা জমি বন্ধক নিল দশ হাজার টাকায় এবং সে দু বছর এ জমি ভোগ করে। দু বছর পর টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় পাঁচশ টাকা করে এক হাজার টাকা কম নেয়। এ সুরতগুলো সহীহ কি না? উত্তম পন্থা কোনটি জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : ঋণদাতার জন্য বন্ধকি জমি ভোগ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। এটি মূলত ঋণ প্রদান করে বিনিময়ে সুদ গ্রহণেরই একটি প্রকার। সুতরাং প্রশ্নোল্লেখিত প্রথম পদ্ধতিটি নাজায়েয হওয়ার বিষয়টি সুস্পষ্ট। আর দ্বিতীয় পদ্ধতিটি মূলত ঋণ প্রদান করে বন্ধকি জমি ভোগ করার একটি অবৈধ ছুতা। কারণ এক্ষেত্রে আলাদাভাবে ইজারা চুক্তি করা হয় না; বরং জমি ভোগ করার শর্তেই ঋণ দেওয়া হয় এবং ঋণের সুবিধা পাওয়ার কারণেই জমির মালিক নামমাত্র মূল্যে ভাড়া হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। সুতরাং প্রশ্নোল্লেখিত দুটি কারবারই নাজায়েয।
প্রকাশ থাকে যে, উক্ত কারবার বৈধভাবে করতে চাইলে শুরু থেকেই বন্ধকি চুক্তি না করে ভাড়া বা লীজ চুক্তি করবে। যার বিবরণ হল, জমির মালিক জমি ভাড়া দিবে। তার যত টাকা প্রয়োজন সেজন্য যত বছর ভাড়া দিতে হয় একত্রে তত বছরের জন্য ভাড়া দিবে। যেমন-এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া ৫ হাজার টাকা। মালিকের ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাহলে সে ৪ বছরের জন্য জমি ভাড়া দিবে। এক্ষেত্রে অগ্রিম ২০ হাজার টাকা নিয়ে নিবে। এক্ষেত্রে জমির ভাড়া স্থানীয় ভাড়া থেকে সামান্য কম বেশিও হতে পারে। এরপর ভাড়ার মেয়াদ শেষ হলে অর্থ দাতা জমি ফেরত দিবে, কিন্তু প্রদেয় টাকা ফেরত পাবে না। অবশ্য সময়ের আগে ফেরত দিলে যে কয়দিন ভাড়ায় ছিল সে পরিমাণ ভাড়া কর্তন করে অবশিষ্ট টাকা ভাড়াটিয়া ফেরত পাবে।
-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৮/২৪৪-২৪৫; শরহু মুখতাসারিত তহাবী ৩/১৪৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২; বাদায়েউস সানায়ে ৫/২১২; শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসী ৩/১৯৬-১৯৭; ইলাউস সুনান ১৮/৬৪
[ফতওয়া বিভাগ, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা]
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….
প্রশ্ন :
আমাদের দেশে একটি প্রচলন আছে, আবাদি জমি বন্ধক রেখে taka নেওয়া। যেমন : আপনার 50 শতক জমি 1 লক্ষ্য takar বিনিময়ে আমার নিকট বন্দক রাখলেন, সেই জমি taka ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত আমার জন্য ভুগ করা যায়েজ হবে কিনা??
উত্তর দিয়ে বাধিত করবেন।
আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন এবং এলেম নাফেয়া দান করুন.
প্রশ্নকর্তা-আব্দুল্লাহ আলমামুন।
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
উক্ত চুক্তিটি জায়েজ হবার দু’টি সূরত রয়েছে। এ দু’টি সূরত অনুসরণ করলে এ চুক্তি জায়েজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
১ম সূরত
যিনি জমীন নিবেন তিনি এ হিসেবে চুক্তি করবেন যে, তিনি জমিটি ভাড়া নিচ্ছেন। নামমাত্র কিছু মূল্য মাসিক ভাড়া হিসেবে নির্দিষ্ট করে নিবে। যেমন ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা। আর অগ্রিম ভাড়া হিসেবে প্রদান করবে ১/২ লাখ টাকা।
তারপর যেদিন জমিনটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন আগের নির্ধারণকৃত নামমাত্র ভাড়ার টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দেবে জমিনটি ভোগদখলকারী তথা জমির ভাড়াটিয়াকে।
যেমন-
আব্দুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আব্দুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আব্দুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায় আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে ভাড়া দিবে। মাসিক ভাড়া নির্দিষ্ট করে নিল কথার কথা ৫০ টাকা। যতদিন আব্দুর রহমান জমিটি রাখবে ততদিন মাসিক ৫০ টাকা করে ভাড়া প্রদান করবে। মাসিক ভাড়া অগ্রিম হিসেবে আব্দুর রহমান ৫ লাখ আব্দুল্লাহকে দিয়ে দিবে। ফলে জমিটির ভাড়াটিয়া হিসেবে আব্দুর রহমান ভোগদখল করতে থাকবে। আর আব্দুল্লাহ টাকাটি খরচ করতে পারবে।
তারপর যেদিন আব্দুল্লাহ তার জমিটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন বিগত দিনের মাসিক ভাড়া বাদ দিয়ে বাকি টাকা প্রদান করে জমিটি ফেরত নিয়ে নেবে। কথার কথা যদি ৫ মাস পর ফেরত নিতে চায়, তাহলে ৫ মাসের ভাড়া ২৫০ টাকা রেখে বাকি এক লাখ নিরান্নব্বই হাজার সাতশত পঞ্চাশ টাকা প্রদান করে আব্দুল্লাহ সাহেব তার জমিটি ফেরত নিয়ে নিবেন। {জাদীদ ফিক্বহী মাসায়েল-১/১৪৭-১৪৮, মালে হারাম আওর উসকে মাসারেফ ওয়া আহকাম-৮৫}
وَأَمَّا زَكَاةُ الْأُجْرَةِ الْمُعَجَّلَةِ عَنْ سِنِينَ فِي الْإِجَارَةِ الطَّوِيلَةِ الَّتِي يَفْعَلُهَا بَعْضُ النَّاسِ عُقُودًا وَيَشْتَرِطُونَ الْخِيَارَ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فِي رَأْسِ كُلِّ شَهْرٍ فَتَجِبُ عَلَى الْآجِرِ لِأَنَّهُ مَلَكَهَا بِالْقَبْضِ وَعِنْدَ الِانْفِسَاخِ لَا يَجِبُ عَلَيْهِ رَدُّ عَيْنِ الْمَقْبُوضِ بَلْ قَدْرُهُ فَكَانَ كَدَيْنٍ لَحِقَهُ بَعْدَ الْحَوْلِ (فتح القدير- كتاب الزكاة، 2/174)
২য় সূরত
দু’টি চুক্তি সম্পাদন করবে। প্রথমে ক্রয় বিক্রয় চুক্তি। তারপর আলাদা আরেকটি চুক্তি নামায় যেদিন টাকা পরিশোধ করতে পারবে সেদিন জমিটি প্রথম জমির মালিক ক্রয় নিয়ে নিয়ে যাবে আর বর্তমান মালিক তা বিক্রি করে দিবে মর্মে চুক্তি সম্পাদিত করবে।
যেমন-
আব্দুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আব্দুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আব্দুল্লাহ তার জমিটি আব্দুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আব্দুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায় আব্দুল্লাহ তার জমিটি ৫ লাখ টাকায় আব্দুর রহমানের কাছে বিক্রি করে টাকা গ্রহণ করে নিবে। এভাবে আব্দুল্লাহ টাকার মালিক ও আব্দুর রহমান জমিটির ভোগ দখলের মালিক হয়ে যাবে।
তারপর ভিন্ন আরেকটি চুক্তি সম্পাদন করবে। যাতে লিখবে যে, যেদিন আব্দুল্লাহ ৫ লাখ টাকা দিতে পারবে, সেদিন আব্দুর রহমান জমিটি আব্দুল্লাহের কাছে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে দিবে।
এভাবে ভিন্ন দু’টি চুক্তি সম্পাদিত করলে টাকা খরচ করা এবং জমিটি ভোগ দখলের মাঝে অবৈধতার কোন কিছুই বাকি থাকবে না।
لو ذكرا البيع بلا شرط ثم ذكرا الشرط على وجه العقد جاز البيع ولزم الوفاء بالوعد، إذ المواعيد قد تكون لازمة فيجعل لازما لحاجة الناس تبايعا بلا ذكر شرط الوفاء ثم شرطاه يكون بيع الوفاء؛ (رد المحتار، كتاب البيوع، مطلب فى البيع بشرط فاسد-7/281، 547، البحر الرائق، كتاب البيوع، باب خيار الشرط-6/8)
والله اعلم بالصواب
উত্তর লিখনে
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।
![]()
